জৈব ও অজৈব সার

 

 

জৈব ও অজৈব সার
[Manures And Fertilizers]

 

Ø Syllabus: Manures and fertilizers: Role of manures and fertilizers in crop production, important manures and fertilizers: compost, farm yard manures, green manure, oil cake, ammonium sulphate, urea, calcium, ammonium nitrate, super phosphate, potassium sulphate, mixed fertilizers-their properties and uses
সূচনা (Introduction):
জমিতে ক্রমাগত চাষ, ভূমিক্ষয় ও অন্যান্য কারণে মাটিতে গাছের খাদ্য উপাদানগুলোর ঘাটতি পড়ে ও মাটিতে উর্বরতা হ্রাস পায়। সুতরাং উদ্ভিদের চাহিদা মেটানোর জন্য এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখা ও এর উন্নতির জন্য যে সব জৈব ও রাসায়নিক পদার্থ আলাদাভাবে মাটিতে প্রয়োগ করা হয়, তাকেই সার বলে। এক কথায় গাছের কৃত্রিম খাদ্যকেই সার বলা হয়। সুষম সার প্রয়োগ করলে গাছ প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদানগুলো সঠিক পরিমাণে মাটি থেকে সহজেই নিতে পারে। সারগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা– [1] জৈব সার  {Organic manures} [2] অজৈব সার বা রাসায়নিক সার {Inorganic fertilizers}

 

  • জৈব সার(organic manures):

জীবজাত সারকে জৈব সার বলা হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশিষ্টাংশ দিয়ে জৈব সার তৈরি করা হয়। সুতরাং যে সব জৈব পদার্থ মাটিতে সরাসরি বা পচিয়ে প্রয়োগ করলে মাটিতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদানগুলো যুক্ত হয়, তাকে জৈব সার বলে। জৈব সারে উদ্ভিদের প্রধান তিনটি খাদ্যোপাদান, যেমন: নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম থাকে, কিন্তু এদের পরিমাণ খুব কম। তাই জৈব সারের মাধ্যমে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করা যায় না। সুতরাং জমিতে জৈব সার দিলেও গাছের প্রয়োজন মেটাতে রাসায়নিক সার দিতেই হয়। তাছাড়া গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদানের সবটাই জৈব সারের মাধ্যমে দেওয়ার মত জৈব সার পাওয়া সম্ভব নয়। মাটিতে প্রয়োগ করলে জৈব সার পচতে শুরু করে এবং এর ফলে জৈব সারের খাদ্যগুলো ধীরে ধীরে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। সেইজন্য ফসল বোনা বা রোয়ার প্রায় একমাস
আগে জমিতে সার প্রয়োগ করে জমিতে চাষ দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। জৈব সার উদ্ভিদের খাদ্য যোগায়, মাটির ভৌত অবস্থার উন্নতি করে, মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, মাটিতে বায়ুচলাচলের উন্নতি করে ও মাটির উপকারী জীবাণুদের সক্রিয় করে তোলে। তাছাড়া জৈব সার রাসায়নিক সার প্রয়োগের কুফলগুলো দূর করে। সেইজন্য সব সময় সব ফসলের চাষে রাসায়নিক সার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে পরিমাণমত জৈবসারও প্রয়োগ করা দরকার। কৃষিকাজে যেসব জৈব সার ব্যবহার করা যায়, সেইগুলোকে মোটামুটি নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

 

() উদ্ভিজ্জ জৈব সার (Bulky organic manures of Plant Origin):() খামারের সার (Farmyard manure), () আবর্জনা সার-শহরের ও গ্রামের (Compost: Urban and Rural), তলানি সার (Slude)প্রভৃতি। () সবুজ সার (Green manures) () খোল(Oil cakes): সরষের খোল (Mustard Cake),বাদাম খোল (Groundnut Cake),তিসির খোল (Linseed Cake),রেড়ির খোল (Castor Cake),নিম খোল (Neem Cake),তিল খোল (Till Cake) প্রভৃতি।

 

() প্রাণীজ জৈব সার (Bulky Origin manures of Animal Origin):() গোবর সার (Cow dung), () কেঁচো সার (Vermi Compost), () কষাইখানার উপজাত জৈবসার (Waste Product of Slaughter house): হাড়গুঁড়া(Bone meal),শুকনো রক্ত(Blood meal),চামড়ার অবশেষ প্রভৃতি, () মাছের সার (Fish Product): মাছগুঁড়ো (Fish meal), () গুয়ানো (Guano):সামুদ্রিক পাখির মল ও মৃতদেহ থেকে উvপন্ন সারকে গুয়ানো বলে।, () জীবাণু সার (Biofertilizers)

 

  • অজৈব সার বা রাসায়নিক সার (Inorganic fertilizers):

বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে সম্পূর্ণ কৃত্রিম পদ্ধতিতে কলকারখানায় যে সার তৈরি হয়, তাকে অজৈব বা রাসায়নিক সার বলে। রাসায়নিক সারে উদ্ভিদ-খাদ্যগুলো সহজলভ্য অবস্থায় ও অধিক পরিমাণে থাকে। তবে রাসায়নিক সারে একটি বা দুটির বেশি খাদ্যোপাদান থাকে না। তাই গাছের প্রধান তিনটি খাদ্যোপাদান যথা : নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম প্রভৃতি প্রয়োগ করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। উদ্ভিদ খাদ্য পাওয়ার ভিত্তিতে অজৈব সারকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা :

 

() মৌলিক বা সরল সার (simple fertilizers): যে রাসায়নিক সারে একটি মাত্র উদ্ভিদ খাদ্য থাকে, তাকে সরল বা মৌলিক সার বলে। উদ্ভিদ খাদ্য পাওয়ার ওপর নির্ভর করে এই সারকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যথা :

 

() নাইট্রোজেনঘটিত রাসায়নিক সার (Nitrogenous fertilizer): এই সার থেকে কেবলমাত্র নাইট্রোজেন(N) পাওয়া যায়। যথা :

 

অ্যামোনিয়াম সালফেট (Ammonium Sulphate), অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (Ammonium Chloride), ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (Calcium nitrate), অ্যামোনিয়াম সালফেট নাইট্রেট (Ammonium sulphate nitrate), ক্যালসিয়াম অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট (Calcium Ammonium nitrate), ইউরিয়া (Urea)প্রভৃতি।

 

() ফসফরাস ঘটিত রাসায়নিক সার (Phosphatic fertilizer): এই সার থেকে কেবলমাত্র ফসফরাস ( P2O5)পাওয়া যায়। যথা:সিঙ্গল সুপার ফসফেট-(Single Super phosphate), ডবল সুপার ফসফেট (Double Super phosphate), ট্রিপল সুপার ফসফেট (Triple Super phosphate), বেসিক স্লাগ বা ধাতুমল (Basic Slag), রক ফসফেট (মুসৌরী ও পুরুলিয়া) প্রভৃতি।

 

() পটাশিয়াম ঘটিত রাসায়নিক সার (Potassic fertilizer): এই সার থেকে কেবলমাত্র পটাশিয়াম(K2O)পাওয়া যায়। যথা: মিউরিয়েট অব পটাশ বা পটাশিয়াম ক্লোরাইড(Muriate of Potash of Potassium Chloride), পটাশিয়াম সালফেট(Potassium sulphate), পটাশিয়াম নাইট্রেট(Potassium nitrate), পটাশিয়াম ফসফেট (Potassium Phosphate), প্রভৃতি।

 

() যৌগ রাসায়নিক সার (Complex fertilizer): এই সার থেকে একের বেশি উদ্ভিদ খাদ্য পাওয়া যায়। যথা: ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (Di-ammonium Phosphate), অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ফসফেট (Ammonium nitrate Phosphate), সুফলা ২০ : ২০ : ০ (Suphala 20 : 20 : 0), ইউরিয়া অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা গ্রোমর ২৮ : ২৮ : ০ (Urea Ammonium Phosphate or Gromor 28 : 28 : 0), প্রভৃতি। তাছাড়া বাজারের ইফকো/পরশ ১০ : ২৬ : ২৬ (IFFO Paras 10 : 26 : 26), সুফলা ১৫ : ১৫ : ১৫ (Suphala 15 : 15 :15), গ্রোমোর ১৪ : ৩৫ : ১৪ (Gromor 14 : 35 : 14)প্রভৃতি নামেও সম্পূর্ণ সার(Complete and balanced fertilizer) পাওয়া যায়।

 

  • শস্য উvপাদনে জৈব ও অজৈব সারের ভূমিকা (Role of manures and fertilizers in crop production):

আমাদের জীবনধারণের জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, শস্য উvপাদন তথা উদ্ভিদের পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্যও উদ্ভিদের খাদ্যের তেমনই প্রয়োজন। খাদ্য ছাড়া কোনও জীবই বাঁচতে পারে না। প্রাণী ও উদ্ভিদের খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। উদ্ভিদ নিজেরাই নিজেদের খাদ্য তৈরি করে নেয়। অবশ্য এর জন্য দরকার সূর্যালোক, বায়ুর কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মাটির নানা রকমের খাদ্যোপাদান। আগেই বলেছি যে উদ্ভিদের স্বাভাবিক পোষণের জন্য ষোলটি আবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানের প্রয়োজন। মাটির কোন একটি খাদ্যোপাদানের অভাব ঘটলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ভালো ভাবে হয় না এবং ফলনও হ্রাস পায়। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ও অক্সিজেন, কোনও কোনও গাছ নাইট্রোজেন (শিম্বিগোত্রীয় উদ্ভিদের বেলায়), জল থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন এবং মাটি থেকে বাকী সব খাদ্যোপাদান সংগ্রহ করে থাকে। মাটিতে খাদ্যোপাদানগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম প্রভৃতি উদ্ভিদের প্রধান (Primary plant food elements)খাদ্যোপাদান এবং গাছ তুলনামূলক ভাবে এ চারটি খাদ্যোপাদান বেশি মাত্রায় গ্রহণ করে থাকে। জমিতে বারবার চাষ করার ফলে বা অন্যকারণে মাটিতে খাদ্যোপাদানগুলোর পরিমাণ হ্রাস পায়। তাই উদ্ভিদের সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্য জৈব ও অজৈব সারের মাধ্যমে মাটিতে খাদ্যোপাদানগুলো প্রয়োগ করতে হয়। জৈব সার প্রয়োগ করলে মাটিতে উর্বরতা বাড়ে, মাটির ভৌত অবস্থার উন্নতি হয় ও মাটির জল ও বাতাস চলাচল ভালো হয়। তবে জৈব সারে খাদ্যোপাদানগুলো খুব কম পরিমাণ থাকে। তাই জৈব সার প্রয়োগ করে উদ্ভিদের চাহিদা মেটানো যায় না। সেজন্য জমিতে জৈব সার দিলেও গাছের প্রয়োজন মেটাতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতেই হয়। রাসায়নিক সারে উদ্ভিদ খাদ্যের পরিমাণ বেশি থাকে। তবে বার বার রাসায়িনিক সার প্রয়োগ করলে মাটির ভৌত অবস্থার অবনতি ঘটে। তবে মাটির গঠন ঠিক রাখা ও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের জন্য জৈব এ অজৈব সার পরিমাণ মত প্রয়োগ করতে হবে। আগেই বলেছি যে, গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদানের সবটাই জৈব সারের মাধ্যমে দেবার মত জৈব সার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতেই হবে।

জৈব ও অজৈব সারের তুলনা (Comparison between manures and fertilizers):

 

জৈব সার:-(১) জৈব পদার্থ থেকে উvপন্ন সারকে জৈব সার বলে। ব্যতিক্রম:ইউরিয়া।

(২) জৈব সারের মধ্যে গাছের তিনটি প্রধান খাদ্য, যথা: নাইট্রোজেন, ফসফরাস ওপটাশিয়াম থাকে (সংক্ষেপে N.P.K. বলে)।

(৩) জৈব সারে খাদ্য-উপাদানগুলো কম পরিমাণে থাকে।

(৪) জৈব সারে যে উদ্ভিদ খাদ্য থাকে, তার সুফল মাটিতে অনেকদিন থাকে।

(৫) জৈব সার মাটিতে প্রয়োগ করার পরই উদ্ভিদ খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না।

(৬) জৈব সার মাটির গঠন উন্নত করে, মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, মাটিকে সরস ও আলগা রাখে এবং উপকারী জীবাণুগুলোকে সক্রিয় করে তোলে।

 

 

অজৈবসার:- (১)রাসায়নিক পদ্ধতিতে অজৈব পদার্থ থেকে উvপন্ন সারকে অজৈব সার বলে।

(২)অজৈব সারে একটি বা দুটির বেশি খাদ্য-উপাদান থাকে না।

(৩)অজৈব সারে খাদ্য-উপাদানগুলো বেশি পরিমাণে থাকে।

(৪)অজৈব সারে উদ্ভিদ খাদ্যউপাদানগুলো উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য অবস্থায় থাকায় মাটিতে প্রয়োগ করার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে ও খাদ্যগুলো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়।

(৫)অজৈব সার প্রয়োগ করার কয়েকঘন্টার পর উদ্ভিদ তা থেকে খাদ্য গ্রহণ করেত পারে।

(৬)অজৈব সার প্রয়োগ করলে মাটির ভৌত অবস্থার কোন উন্নতি ঘটে না। কিন্তু এই সার প্রয়োগ করে চাষ করা হলে মাটি অম্ল (Acid) হয়ে যায়।

 

জৈব ও অজৈব সারের তুলনামূলক উপযোগীতা (Comparative Utility of Manures and Fertilizers):

 

জৈব সার (Manures): (১) জৈব সার বাড়িতে তৈরি করা যায়।

(২) জৈব সার ব্যবহারের জন্যে কোন শর্ত মানতে হয় না।

(৩) জৈব সার তৈরি করলে বাড়ী বা অন্যান্য জায়গার পরিবেশ সুস্থ ও দূষণমুক্ত থাকে। কারণ আবর্জনা ইত্যাদি এই সার তৈরি করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

(৪) জৈব সার প্রয়োগ করলে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে।

(৫) জৈব সার প্রয়োগে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকে।

(৬) জৈব সার প্রয়োগ করলে গাছ দীর্ঘ মেয়াদী হয়।

(৭) জৈব সার প্রয়োগ করা গাছের ফল সুস্বাদু হয় ও বেশিদিন বাড়ীতে রাখা যায়।

 

অজৈব সার (Fertilizers):(১) অজৈব সার বাড়ীতে তৈরি করা যায় না। এটি কল-কারখানায় তৈরি হয়।

(২) অজৈব সার ব্যবহার করতে গেলে শর্ত মেনে (যথা: সঠিক পরিমাণে)প্রয়োগ করতে হবে।

(৩) পরিবেশ দূষণ হয়। এর মধ্যে মাটি দূষণ অন্যতম।

(৪) অজৈব বা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে বেশি জল লাগে। ফলে চাষের খরচ বাড়ে।

(৫) রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে গাছের রোগ-পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

(৬) রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে গাছ স্বল্পমেয়াদী হয়।

(৭) রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা গাছের ফল সুস্বাদু হয় না ও বেশিদিন বাড়ীতে রাখা যায় না।

 

  • কয়েকটি দরকারী জৈব সার (Some Important manures):

(১) আবর্জনা সার বা কম্পোষ্ট (Compost):

খামারের আবর্জনা, আগাছা, গোয়ালের ঝাঁটদেওয়া মূত্র মেশানো আবর্জনা, ফসলের অবশিষ্টাংশ প্রভৃতি বিভিন্ন জীবাণুর সাহায্যে পচিয়ে কৃত্রিম উপায়ে যে সার তৈরি করা হয়, তাকেই আবর্জনা সার বলা হয়। আবর্জনা সার তৈরির পদ্ধতিকে আবর্জনা সার প্রস্তুত পদ্ধতি(Composting or Compost making)বলা হয় (The Process of making Compost is known as Composting)। সাধারণত নিম্নলিখিত জিনিসগুলো পচিয়ে আবর্জনা সার তৈরি করা হয়। যথা:

 

(ক) গবাদি পশুর খাওয়ার অনুপযোগী খড়।

(খ) খামারের ঘাস ও আগাছা, কচুরীপানা প্রভৃতি।

(গ) পুরানো থলে, অকেজো কাগজ প্রভৃতি।

(ঘ) আখের পাতা ও ছিবড়া, ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা প্রভৃতির ডাঁটা।

(ঙ) ঘরের ও গোয়ালঘরের ঝাঁট দেওয়া আবর্জনা এবং রান্নাঘরের তরিতরকারীর খোসা প্রভৃতি।

(চ) ফসলের অবশিষ্টাংশ, কাঠের ছাই প্রভৃতি।

 

 

  • আবর্জনা সার তৈরির জন্য দরকারী দ্রব্যাদি (Essential Requirement for Composting):

 

(১) পরিমিত আবর্জনা (A massive organic refuge):

আবর্জনা সার তৈরির জন্য পরিমিত আবর্জনা দরকার। এদের কার্বন ও নাইট্রোজেনর অনুপাত (C : N ratio) বেশি থাকা দরকার। আগেই বলেছি যে, খামারের নানা আবর্জনা থেকে এই সার তৈরি করা হয়।

(২) উপযোগী প্রভাবক (Suitable Starter):

আবর্জনা পচন কতকগুলো জীবাণু দ্বারা সংঘটিত হয় এবং উপযোগী প্রভাবকের মাধ্যমে জীবাণুগুলোকে আবর্জনার পচনের জন্য প্রয়োগ করা হয়। গোবর, গোমূত্র, পায়খানা (night soil), তলানি সার (Sludge)এবং এমনকি অজৈব পদার্থ যেমন : সোডিয়াম নাইট্রেট, অ্যামোনিয়াম সালফেট, ক্যালসিয়াম সায়নামাইড প্রভৃতি হল উপযোগী প্রভাবক।

(৩) জল (Water):

জীবাণুর ক্রিয়াকলাপের জন্য জল একান্ত দরকার। আবর্জনায় যদি ৫০-৬০ শতাংশ আর্দ্রতা থাকে, তবে পচনক্রিয়া ভালো হয়। তাই আবর্জনা বিছানোর পর পরিমিত জল প্রয়োগ করতে হবে।

 

 

 

(৪) বায়ু (Air):

আবর্জনার পচন একটি জারণ ক্রিয়া এবং এর জন্য পরিমিত অক্সিজেন দরকার। আবর্জনা প্রথমদিকে বায়ুজীবী পদ্ধতিতে পচতে থাকে (Aerobic decomposition) এবং এর জন্য সারগাদাটি মাঝে মাঝে উল্টে দেওয়া দরকার। তবে ৩-৪ মাস পরে আর গাদাটিকে ওলট-পালট (Turning) করা উচিত নয়। কারণ এই সময়ে তা করলে ৫০ শতাংশ জৈবপদার্থ ও নাইট্রোজেন নষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য পরে আবর্জনাগুলো অবায়ুজীবী পদ্ধতিতে (Anaerobic decomposition) পচে এবং এর ফলে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের অপচয় কম হয়।

 

  • আবর্জনা সার তৈরির পদ্ধতি (System of Composting):
    কম্পোষ্ট বা আবর্জনা সার তৈরির নানান পদ্ধতি আছে। যথা:

(১) অ্যাডকো পদ্ধতি (Adco Process):

১৯২১ সালে ইংল্যান্ডে হ্যাচিনসন (Hutchinson) ও রিচার্ড (Richard) সর্বপ্রথম আবর্জনা সার তৈরির এই পদ্ধতিটির প্রবর্তন করেন। Agricultural Development Company (ADCO), নামক ইংল্যান্ডের একটি প্রাইভেট কোম্পানি অ্যাডকো পাউডার তৈরি করে ও আবর্জনা সার তৈরির জন্য অ্যাডকো পাউডার সরবরাহ করে থাকে। অ্যাডকো পাউডারের সমাবেশ (Composition) জানা যায় নাই। তবে ফাউলার (Fowler) এর মতে অ্যামোনিয়াম ফসফেট, ইউরিয়া ও সায়নামাইড মিশিয়ে অ্যাডকোপাউডার তৈরি করা হয়। দুজন কৃষিবিজ্ঞান (Collison and Conn) পরীক্ষা করে দেখেছেন যে প্রতি টন আবর্জনার সঙ্গে নীচের মিশ্রন প্রয়োগ করে সার তৈরি করলে অ্যাডকো পাউডার দিয়ে তৈরি সারের মতই এর গুণাবলী হয়। যথা:

অ্যামোনিয়াম সালফেট

 

৬০ পাউন্ড বা ২৭ কিলোগ্রাম
সুপার ফসফেট

 

৩০ পাউন্ড বা ১৩.৫০০ কিলোগ্রাম
মিউরিয়েট অব্ পটাস

 

২৫ পাউন্ড বা ১১.২৫০ কিলোগ্রাম
গুঁড়া চুনাপাথর

 

৫০ পাউন্ড বা ২২.৫০০ কিলোগ্রাম

 

৯০ বর্গফুট [১৫ ফুট (৪৫০ সে.মি.) X ৬ ফুট (১৮০ সে.মি.)]আয়তনের জায়গা নির্বাচন করে সেই জায়গায় এক ফুট পুরু করে আবর্জনা বিছিয়ে পরিমিত জল ও অ্যাডকো পাউডার (প্রতি ১০০ কেজি আবর্জনার সঙ্গে ৭ কেজি অ্যাডকো পাউডার) প্রয়োগ করেত হবে। ছবার এইভাবে আবর্জনা স্তরে স্তরে প্রয়োগ করলে স্তূপটিতে আবর্জনার পরিমাণ মোটামুটি এক টনের মত হবে। প্রতি স্তরেই অ্যাডকো পাউডার প্রয়োগ করতে হবে। স্তূপটি ৬ ফুটের (১৮০ সে. মি.) বেশি উঁচু করা চলবে না। আবর্জনার স্তূপটি তৈরি করার কাজ শেষ হয়ে গেলে জলপ্রয়োগ ছাড়া স্তূপে আর কোন কাজ করা চলবে না। আবর্জনার পচন দেরী হলে স্তূপটিকে ওলটপালট করে দিতে হবে। অবশ্য পচন ঠিকমত চললে স্তূপটিকে ওলটপালট (Turning) করে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ৪-৬ মাসের মধ্যে আবর্জনা পচে সার তৈরি হয়ে যাবে। এটি বায়ুজীবি

পদ্ধতি (Aerobic Method)।

 

  • সুবিধা (Advantages):

 

(১) আবর্জনা সার তৈরির জন্যে এই পদ্ধতিটি বিশেষ উপযোগী।

(২) আবর্জনাগুলো ভালোভাবে পচে জৈব সারে পরিণত হয়।

(৩) আবর্জনাগুলো ৪-৫ মাসের মধ্যে পচে উত্তম জৈব সারে পরিণত হয়।

  •  অসুবিধা (Disadvantages):

(১) এটি একটি বায়ুজীবী (Acrobic) পদ্ধতি। তাই সার গাদার বায়ুচলাচল ও আবর্জনার সুষম পচনের জন্যে স্তূপটিকে ওলটপালট করে দেওয়া দরকার। এতে আবর্জনা সার তৈরির খরচ বাড়ে।

(২) অ্যাডকো পাউডার সংগ্রহ করার অসুবিধা থাকায় পদ্ধতিটি বহুল প্রচলিত নয়।

(২) অ্যাকটিভেটেড কম্পোষ্ট পদ্ধতি(Activated Compost Process):

১৯২২ সালে Indian Institute of Science, Bangalore-এ সর্বপ্রথম এ পদ্ধতিতে আবর্জনা সার তৈরির কাজ শুরু হয়। ফাউলার ও রেজ (Fowler and Redge) গোবর সার, তলানি সার (Sludge) ও সিউয়েজ (Sewage) অর্থাৎ বড়ো বড়ো শহরের বদ্ধ নালার ময়লা জল প্রভৃতিকে এ পদ্ধতিতে কম্পোষ্ট তৈরির জন্য প্রভাবক(Starter) হিসাবে ব্যবহার করেছেন। প্রস্তুত প্রণালী দেশী পদ্ধতির ন্যায়।

  • সুবিধা (Advantages):

(১) শহরের আবর্জনা ও বদ্ধ নর্দমার জল থেকে ভালো মানের আবর্জনা সার তৈরি করা যায়।

(২) স্লাজ ও সিউয়েজ প্রভাবক হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

 

  • অসুবিধা (Disadvantages):

(১) বড়ো বড়ো শহরে এ পদ্ধতিতে সার তৈরি করা হয়। তাই পদ্ধতিটি গ্রামবাংলায় বহুল প্রচলিত নয়।

(২) এই পদ্ধতিতে তৈরি সারে অনেক ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। তাই এ সার জীবাণুনাশক দ্রব্য (যথা: ক্লোরিন, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি) দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করা উচিত।

 

(৩) ইন্দোর পদ্ধতি (Indore Process):

ইন্দোরের Institute of Plant Industry-তে হাওয়ার্ড ও ওয়ার্ড (Howard and Ward) সর্বপ্রথম এ পদ্ধতিতে আবর্জনা সার তৈরি করেন। এ পদ্ধতিতে গোবর প্রভাবক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এক প্রকার সবাত জীবাণু দ্বারা এ প্রক্রিয়ায় কম্পোষ্ট সার তৈরি হয়। ৩০ ফুট (৯০০ সে.মি.) লম্বা, ১৪ ফুট (৪২০ সে.মি.) চওড়া ও ২ ফুট (৬০ সে.মি.) গভীর করে গর্ত তৈরি করতে হবে। তারপর আবর্জনা স্তরে স্তরে বিছাতে হবে এবং প্রতি স্তরেই গোবর প্রয়োগ করতে হবে। স্তূপটি তিন ফুট (৯০ সে.মি.) উঁচু হলে আর আবর্জনা ও গোবর প্রয়োগ করা চলবে না। ভালোভাবে পচনের জন্য দু সপ্তাহ, চার সপ্তাহ এ আট সপ্তাহ পরে তিনবার স্তূপটিকে ঘেঁটে দিতে হবে। এভাবে য্ত্ন-পরিচর্যা নিলে তিন মাস পরেই কম্পোষ্ট সার জমিতে প্রোয়গের উপযোগী হয়ে যাবে। এ পদ্ধতিতে তৈরি সারে শতকরা ১ ভাগ নাইট্রোজেন, ০.৫ ভাগ ফসফরাস ও ৩ ভাগ পটাশিয়াম থাকে।

  •  সুবিধা (Advantages):

(১) গ্রামাঞ্চলে এ পদ্ধতিতে আবর্জনা সার তৈরি করা যায়।

(২) এ পদ্ধতিতে প্রভাবক হিসাবে গোবর ব্যবহার করা হয়। ফলে পচনক্রিয়া তাড়াতাড়ি হয় এবং উৎপন্ন সার উন্নতমানের হয়।

(৩) এ পদ্ধতিতে তৈরি আবর্জনা সার তিন মাসের মধ্যেই জমিতে প্রয়োগের উপযোগী হয়।

  •    অসুবিধা (Disadvantages):

(১) গ্রামাঞ্চল ছাড়া অন্য জায়গায় এই পদ্ধতিটি বিশেষ কার্যকরী নয়।

 

(৪) বাঙ্গালোর পদ্ধতি (Bangalore Process or Town Compost):

বাঙ্গালোর Indian Institute of Science-এসি.এন আচার্য (C.N. Acharya) কর্তৃক এই পদ্ধতিতে সর্বপ্রথম আবর্জনা সার তৈরি করা হয়। শহরের বাইরে প্রয়োজন মত মাপের গর্ত খুঁড়ে তাতে শহরের আবর্জনা, ময়লা ফেলে এ পদ্ধতিতে কম্পোষ্ট তৈরি করা হয়। পরপর দুটি গর্তের মাঝে পাঁচফুট (১৫০ সে.মি.) চওড়া রাস্তা রাখতে হবে। লোকসংখ্যা অনুযায়ী গর্তের মাপ নানারকমের হবে। যথা:

লোকসংখ্যাগর্তের মাপ
লম্বাচওড়াগভীর
১০,০০০ এর নীচে২০ ফুট(৬০০সে.মি.)৬ফুট(১৮০ সে.মি.)৩.৬ ফুট(১০৫ সে.মি.)
১০,০০০-২০,০০০২৫ ফুট(৭৫০সে.মি.)৭ ফুট(২১০ সে.মি.)৪ ফুট(১২০ সে.মি.)
২০,০০০-৩০,০০০৩০ ফুট(৯০০সে.মি.)৮ ফুট(২৪০ সে.মি.)৪ ফুট(১২০ সে.মি.)
৩০,০০০-৫০,০০০৩৫ ফুট(১০৫০সে.মি.)৮ ফুট(২৪০ সে.মি.)৪ ফুট(১২০ সে.মি.)
৫০,০০০ এর উপর৪০ ফুট(১২০০সে.মি.)

 

৮ ফুট(২৪০ সে.মি.)৪ ফুট(১২০ সে.মি.)

 

প্রথম গর্তে ৯-১০ ইঞ্চি (২২.৫-২৫ সে.মি.) পুরু করে আবর্জনা বিছাতে হবে। তার উপর ৩ ইঞ্চি (৭.৫ সে.মি.) পুরু করে পায়খানা (Night Soil)দিতে হবে। প্রতিদিন আবর্জনা ও গুঁড়ো মাটি দিয়ে পায়খানার স্তর ঢেকে দিতে হবে। তার ফলে দুর্গন্ধ ছড়াবে না ও মশামাছির প্রকোপও কম হবে। প্রতিটি গর্ত জমি থেকে এক থেকে দেড় (১.৫ ফুট)ফুট (৩০-৪৫ সে.মি.) উঁচু করে ভরাতে হবে এবং তার ওপর মাটি ছড়িয়ে দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে ৩-৪ মাসের মধ্যে উৎকৃষ্ট কম্পোষ্ট তৈরি হয়। একে শহরের আবর্জনা সার (Town compost) বলে।

  •    সুবিধা (Advantages):

(১) শহরের আবর্জনা থেকে সার তৈরি করা হয়। তাই এ সারের মূল্য কম হয়।

(২) এ পদ্ধতিতে সার তৈরি করলে শহরের দুর্গন্ধ রোধ হয়।

(৩) নালায় সার তৈরি করা হয়। ফলে আর্দ্রতা ও নাইট্রোজেনের অপচয় কম হয়।

(৪) এ পদ্ধতিতে সার তৈরি করলে আবর্জনাকে ওলট-পালট করার দরকার হয় না। ফলে মজুর কম লাগে।

(৫) এ পদ্ধতিতে তৈরি সারে এন(N)ও পি(P) বেশি পরিমাণে থাকে। তাই এটি একটি উত্তম জৈব সার।

(৬) এ পদ্ধতিতে সার তৈরি করলে মাছির উপদ্রব হ্রাস পায়।

(৭) শহরতলীতে সব্জি চাষের ক্ষেত্রে এটি খুব উপযোগী সার।

  •    অসুবিধা (Disadvantages):

(১) এ সারের মধ্যে রোগজীবাণু থাকে। তাই জীবাণুনাশক দ্রব্য দিয়ে শোধন করে নিয়ে প্রয়োগ করতে হয়।

(২) এ পদ্ধতিতে সার তৈরির জন্যে মল-মূত্রকে (Night Soil)প্রভাবক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তাই সংস্কারবশত অনেকেই এ সার ব্যবহার করতে চায় না।

এসব পদ্ধতির সমন্বয়ে আমাদের দেশী পদ্ধতির (Country method)সৃষ্টি হয়েছে।

()দেশি পদ্ধতি (Country method):

এ পদ্ধতিতে কম্পোষ্ট দুভাবে যেমন স্তূপ করে (Heap) ও র্তে(Pit) তৈরি করা যায়। তবে গর্তে সার তৈরি করাই ভালো। বাড়ীর কাছাকাছি উঁচু জায়গায় ১৫ ফুট লম্বা (৪৫০ সে.মি.), ৫ ফুট (১৫০ সে.মি.) চওড়া ও ৩ ফুট (৯০ সে.মি.) গভীর ও চারদিকে এক ফুট (৩০ সে.মি.) উঁচু আলযুক্ত গর্ত করতে হবে। গর্তের ওপর একটি ছাউনি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্য গর্তটি পাকা করতে পারলে খুব ভালো হয়। খামারের পাওয়া আবর্জনাগুলো গর্তে স্তরে স্তরে বিছাতে হবে এবং প্রতি স্তর বিছানোর পর গোবর গোলা জল দিয়ে স্তরটিকে ভিজিয়ে দিতে হবে। অবশ্য সুপার কম্পোষ্ট তৈরি করার জন্য গর্তটি সমান তিনভাগে ভাগ করে প্রথম ভাগে এক ফুটের (৩০ সে.মি.) একটি আবর্জনাস্তর বিছিয়ে তার ওপর ৭ কেজি সুপার ফসফেট (সিঙ্গল) ছড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে দ্বিতীয় স্তর (এক ফুট উঁচু) ও তৃতীয় স্তর বিছানোর পর যথাক্রমে ৭ কেজি ও ৬ কেজি সুপার ফসফেট প্রয়োগ করতে হবে। এইভাবে ২০ কেজি সুপার ফসফেট (সিঙ্গল) দিয়ে পুনরায় আবর্জনা ফেলে আলের ওপর অবধি উঁচু করতে হবে। গর্তটি ভর্তি হয়ে গেলে স্তূপের ওপরটা গোবর ও মাটির পাতলা স্তর দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সার গর্তের প্রথম ভাগটি ভর্তি হয়ে গেলে তৃতীয় ভাগটি ও শেষে মাঝের দ্বিতীয় ভাগটি একইভাবে ভর্তি করতে হবে। পুরো গর্তে মোট ৬০ কেজি সুপার ফসফেট লাগবে। ৩০-৪০ দিন পর স্তূপটিকে কোদাল দিয়ে উল্টে দিতে হবে বা পাশাপাশি ২-৩টি সারের গর্ত থাকলে প্রথম গর্ত ভর্তি হয়ে গেলে সার দ্বিতীয় গর্তে ও দ্বিতীয় গর্ত থেকে তৃতীয় গর্তে স্থানান্তরিত করেত হবে। এর ফলে সারের পচন ভালো হবে। সার তৈরি হতে ৪-৫ মাস সময় লাগে। উক্ত মাপের গর্ত থেকে তিন টন পরিমাণ সার পাওয়া যায়। এইভাবে তৈরি সারে শতকরা এক ভাগ নাইট্রোজেন, এক ভাগ ফসফরাস ও এক ভাগ পটাশিয়ামথাকে। এইভাবে তৈরি সারকে সুপার কম্পোষ্ট (Super Compost) বলে।

 

(৬) কচুরিপানারকম্পোষ্ট (Water Hyacinth Compost):

আমাদের দেশে নদী-নালা, খাল, বিল, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে কচুরিপানা জন্মায়। এইগুলোকে জল থেকে তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় পচিয়ে উত্তম সার তৈরি করে নেওয়া যায়। সাধারণত জলাশয়ের পাড়ে বা কাছাকাছি কোন জায়গায় কচুরিপানার কম্পোষ্ট তৈরি করে নেওয়া যায়। কচুরিপানা কোন নির্দিষ্ট জায়গায় গাদা করে রেখে (Heap method) বা গর্তে (Pitmethod)জমা করে পচিয়ে সার তৈরি করা যায়। ২০-২৫ ফুট (৬.০-৭.৫ মিটার) লম্বা, ৭-৮ ফুট (২.১০-২.৪০ মিটার) চওড়া ও ৪-৫ ফুট (১.২০-১.৫০ মিটার) গভীর গর্ত করে তাতে কচুরিপানা স্তরে স্তরে বিছানো হয় এবং প্রতিস্তর বিছানোর পর তার ওপর গোবর গোলা জল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। গর্তটি ভর্তি হয়ে গেলে তার ওপর গোবর মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। এক মাসের মধ্যে স্তূপ পচে বসে যায়। এ সময়ে স্তূপটিকে কোদাল দিয়ে উল্টে দেওয়া দরকার। অপচা ডাঁটাগুলো পচা সার দিয়ে ঢাকা দিয়ে স্তূপটিকে মাটি চাপা দিয়ে দিতে হবে। এতে কিছুদিনের মধ্যে তা পচে সারে পরিণত হয়। দুমাস পরে এ সার জমিতে প্রয়োগ করা যায়। ভালোভাবে পচনের জন্যে জলাশয় থেকে কচুরিপানা তুলে রোদে দু-তিন দিন শুকিয়ে নিতে হবে। কচুরীপানার কম্পোষ্ট তৈরি করলে নাানাবিধ উপকার পাওয়া যায়। যেমন:

(ক) অল্প পরিশ্রমে বিনা খরচায় সার তৈরি করে নেওয়া যায়।

(খ) জলাশয় পরিষ্কার থাকে ও মাছের স্বাস্থ্যহানি হয় না।

(গ) মশার প্রাদুর্ভাব কমে।

(ঘ) জলপথের বাধা দূর হয় ও মাছ ধরতে কোন অসুবিধা হয় না।

 

 

 

 

One Comment

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!